একটি অতিবাস্তব মৃত্যু দৃশ্য

মরে গেল।

সে মরে গেল।

লোকটার চেহারায় ভয়, শঙ্কা, আতঙ্ক স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সে মনে মনে বলল,’মরে গেল। আমি যাবে ভালবাসতাম,

সে মরে গেল।’

তার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো; পুরনো দিনের নানা

ছবি, স্মৃতি ফ্ল্যাশব্যাক করে যেতে লাগল তার চোখের

সামনে। এক গভীর দীর্ঘশ্বাস তার কষ্টের বাষ্পগুলো ভেদ করে

বেরিয়ে এলো।

 

পরিচালক খুশি। সম্ভবত। তার ঠোঁটের একচিলতে হাসিও

হয়তো ফুঁটে উঠেছে।

 

লোকটা হাঁটু গেঁড়ে বসে আছে, জুঁইয়ের মত বৃষ্টির

ফোঁটাগুলো তার শরীরে লেগে থাকা রক্তগুলো ধুয়ে ফেলছে।

তার চোখের কোণে হয়তো দু’ফোঁটা অশ্রু থাকার কথা,

কিন্তু প্রকৃতির কান্নার সাথে তা অনেক আগেই মিশে গেছে।

তার শুধুই মনে পড়ছে রবীন্দ্রনাথের কয়েকটা লাইন,

‘শ্রাবণ গগণ ঘিরে

ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,

শুন্য নদীর তীরে

রহিনু পড়ি-‘

 

পরিচালকের ঠোঁটে তৃপ্তির পূর্ণ হাসি, কিন্তু আমাদের

কাছে সেটা নিষ্ঠুর, দুর্বোধ্য-ও বটে।

 

চারদিকে হাজার হাজার মানুষ, পিঁপড়ার মত

দিশেহারা হয়ে ছুটছে। সময়ের মত চলমান এই জগতে

একমাত্র এই লোকটাই স্থির; স্থবির।

চারদিকে গোলাগুলির আওয়াজ, গ্রেনেডের বিস্ফোড়ন,

বিচ্ছিন্ন পা; সব মিলে আশ্চর্য এক মায়াবী জগত তৈরী

হয়েছে। চারদিকেই অতল অন্ধকারের হাতছানি; মায়াবী

ডাক।

লোকটা বসে আছে।

এখনও কোলাহল শোনা যাচ্ছে, তবে অনেক দূর

থেকে ভেসে আসা মিছিলের শব্দের মত।

লোকটা বসে আছে। তার সামনে এখন নিথর একটা

শরীর; যাকে সে এক সময় ভালবাসত।

 

পরিচালক তার আকাংক্ষিত সাফল্যে মুগ্ধ। নতুন উদ্যোমে

পরিচালক এখন কাজ করবেন।

 

লোকটা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অবিন্যস্ত চুলের

দিকে। মায়াময় দৃষ্টিতে। উষ্ণ হাতে সে ধরে আছে

নির্জীব, শীতল, ফ্যাকাশে সাদা একটা হাত। শাঁখাগুলো

তখনও সাদা, মৃত্যুর ছায়া লোকটার ওপর পড়লেও

শাঁখাগুলোকে এড়িয়ে গেছে, হয়তোবা সেগুলোর মায়াময়তার

কারণে।

 

নতুন দৃশ্যের জন্য পরিচালক প্রস্তুত। অ্যাকশন বললেই

শুরু হবে ‘অভিনয়’।

 

লোকটা তখনও এলো চুলের দিকে তাকিয়ে। ঘর ভর্তি

রাইফেল তার মাথার দিকে লোলু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

বেয়োনেটের খোঁচায় শেষ পর্যন্ত উঠে দাঁড়াতে হল তাকে,

দৃষ্টি আগের মতই, নিস্তব্ধ।

‘হাত উঠাও হারামিকা বাচ্চা!’, কেউ একজন বলল।

‘সালা কো লে যাও!’

‘নাহি, ইসে হাম ইহা হি দাফা কার দেংগে।’

ছোট দাঁড়িঅলা একজন বলল,’হুজুর, আপকা উচিত হোগা

ইসে উয়ো, উয়ে গাথা মে লে কার মারনা-‘

‘ঠিক হ্যায়, লে যাও।’, অমোঘ বাণীর মত কেও বলল।

 

পরিচালক শেষ সিনের জন্য নির্দেশ শেষে এসে বসলেন।

চোখে কৌতুহল, ঠোঁটে সেই হাসি।

 

‘আল্লা কা নাম লে হারামজাদে!’

লোকটা বিড় বিড় করে বলল,’আমি যাকে ভালবাসতাম,

সে মরে গেল।’

‘কেয়া? কেয়া কাঁহা?’

‘ইয়ে সালেকা তো আল্লাই নাহি হ্যায়!’ কেও বলতে

সবাই হেসে উঠল।

লোকটাকে সোজা করে বিাশল একটা গর্তের মুখে

দাঁড় করানোর দুই মিনিট পরই বাজখাঁই গলায়

কেও বলল,’ফায়ার!’

লোকটা টলে পড়তে পড়তে ভাবল,’সে আমাকে

ভালবাসত, তাই আমি তার কাছে যাচ্ছি।’

 

পরিচালক এখন পরিতৃপ্ত। তার ইউনিট এখন

গোছানো হচ্ছে। হয়তো বা অন্য কোথাও শুটিং আছে তার,

আমাদের পরিচালকের।

 

লোকটার চোখ দু’টো খোলা ছিল, অনেক দিন।

পঁচে গলে যাবার আগ পর্যন্ত।

চোখ দু’টো ছিল হিংস্র, প্রতিশোধের আগুনে জ্বল জ্বলে

দু’টো চোখ।

 
সকাল সোয়া এগারোটা, শনিবার
১ ভাদ্র, ১৪১৫
১৬ আগস্ট, ২০০৮
Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s