ধোঁয়াশা ভালবাসা

এই যে ভালবাসার ব্যাপারটা, the concept of love, জিনিশটা খুবই ধোঁয়াশা মনে হয় মাঝে মধ্যে। বিশেষ করে কেউকে যখন ভাল লেগে যায়, ভালবেসে ফেলি হঠাৎ করে।

রাস্তায় হাঁটছি, হঠাৎ কোন মেয়ে পাশ দিয়ে গেল, কয়েক সেকেন্ডের জন্য চোখে চোখ পড়ল, এতটুকুতেই যে কি করে এতো ভাল লেগে যায় তাকে, বলতে পারি না। হতে পারে, কিশোরবেলায় মন আর হৃদয়ের দরোজাসব খোলা থাকে বলেই এত মানুষের আনাগোনা। কিন্তু ভালোলাগার সেই আবিষ্ট অবস্থা থেকে যখন বাস্তবে ফিরে আসি তখন থেকে যায় ‘কিন্তু’, ‘কেন’, ‘কিভাবে’, এরকমই কিছু প্রশ্ন, অস্পষ্ট, এবং উত্তরবিহীন।

আজ দুপুরবেলা কলেজে ক্লাস শেষে সাইন্স ফ্যাকাল্টির বিল্ডিঙে গিয়েছিলাম কেমিস্ট্রি পরতে। বিকেলে পড়াশেষে বিরাট বিরাট লাফে সিঁড়ী ভেঙ্গে নামছিলাম পাঁচতলা থেকে। কিন্তু একতলা যেতেই ইয়ারের একটা মেয়ে সামনে পড়ল। আমি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। আসলে স্কুল জীবন থেকেই মেয়েদের দেখলে আমি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যাই, এটা আমার অনেক পুরনো সমস্যা।

সে আমাকে লক্ষ্য করে নি, তাই কিছুক্ষণ আমাকে তার পিছে হাঁটতে হল অপ্রসস্থ সিঁড়ী দিয়ে। আমি ধীরে ধীরে তার সবকিছু লক্ষ্য করতে লাগলাম। অনেক কিছুই ধরা পড়ল আমার চোখে, আমার মনে হল, হয়ত তার অনেক কিছু জেনে গেলাম। আমি দেখলাম তার পরিপাটি করে বাঁধা চুল, খুব সুন্দর ভাবে কয়েকটা স্তরে সাজিয়ে একটা চুলের কাঁটা গুঁজে রেখেছে সে। হাতের কাজ খুব যে ভাল তা না, তবে গোছানো, নিট অ্যান্ড ক্লিন।

আমার হঠাৎ মনে হল মেয়েটা নিশ্চয় খুব পড়ই পরিপাটি। ইউনিফর্মের ওড়নাটা দেখে বোঝা যায় সে কিছুটা সময় নিয়েই পোশাকটা পড়ে। তার ডান কাঁধে ঝোলানো ব্যাগের বেশ ক’টা জিপারে কিছু কার্টুন ক্যারেক্টারের পুতুলের চাবির রিং।

দেখে ভাল লাগল। সে নিশ্চয় আদুরে ধরণের, যে অন্যদের ভালবাসে, আগলে রাখে। তবে আমি সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ হলাম তার কানে ছোট মতিত মত দুল দেখে। আমি খুব অবাক হলাম, সামান্য কানের দুল, কারো কানে না দুললে যার কোন মূল্যই নেই! আমি মুদ্রামানের কথা বলছি না বসছি যে আকর্ষণটা ধারণ করে সেটা, তার কথা। একটা মেয়ের নিরাভরণ কান দেখে যেন মনে হয় সেটা যে কারোও হতে পারে, কিন্তু অলংকৃত কান মানেই যেন মানুষটা বিশেষ কেউ একজন।

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম। তার প্রতিটা পদক্ষেপে দুল দুটো যেন আরও নতুন হয়ে ধরা পড়ছে আমার কাছে। আমার মনে হচ্ছিল, এত সূক্ষ্ম এই সৌন্দর্যটা, আগে কেন আমার চোখে পড়ল না। ঙ্কি আশ্চর্য, মেয়েদের কানের দুল এতটা সুন্দর হতে পারে!

মেয়েটার পিছু পিছু আমি নিঃশব্দে হাঁটছিলাম, যাতে সে টের না পায়, তার সাবলীলতা, স্বকীয়তা যাতে নষ্ট না হয়। মেয়েটা মৃদু স্বরে গুন গুন করতে করতে ধীর পদক্ষেপে নেমে যাচ্ছিল, ধীরে ধীরে আমার চোখে আরও ধরা পড়ল তার হাঁটার ছন্দ। এক-দুই-তিন, তারপর বিরতি, অবার এক-দুই-তিন, এভাবেই সে সরল ছন্দিক গতিতে নেমে যাচ্ছিল। তার কানের দুলের দোলন আর হাঁটার ছন্দে মিল খুঁজে পেলাম। পরবর্তি পাঁচ মিনিট তার কানের দুলের এই এক-দুই-তিন ছন্দ গুনতে গুনতে আমি হাঁটলাম। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম ছন্দটা যেন আর নেই। এক দমকা হাওয়ায় মেয়েটার হালকা পারফিউমের গন্ধ এসে ঠেকল আমার নাকে। হালকা এই সুগন্ধে আবিষ্ট হয়ে তার পিছু পিছু আরও কিছু দূর হেঁটে গেলাম, খেয়াল করলাম ততক্ষণে নিচে নেমে এসেছি। সে বিল্ডিঙের ছোট গেটটা দিয়ে মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেল, আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত তার পিছু গেলাম। কিন্তু হতাশ হতে হল যখন সে এক রিকশাওয়ালাকে “চার নাম্বার সেক্টর যাবেন?” বলেই রিকশায় উঠে পড়ল।

হতাশ হবার কিছুই ছিল না, আমিতো আর অনন্ত ধরে মেয়েটার পিছে পিছে ছায়ার মত অনুসরণ করতে পারি না, তা হবার নয়।

বাসায় যাবার পুরোটা পথেয়ামি ভাবলাম অদ্ভুত সব কথা। মেয়েটা বাসায় eফিরে কিভেবে তার কানের দুল খুলবে, শাওয়ারের সময় তার উন্মুক্ত কাঁধ কেমন লাগবে, ঘুমানোর সময় তার পা দুটো কেমন লাগবে, এমনই কিছু ছেড়া ছেড়া ভাবনা…

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s