ঘুমন্ত আমি আর জনৈক অজ্ঞ্যাত অতিথি!

** লেখাটা কখনোই সম্পূর্ণ করার কথা লেখক সাহেবের মাথায় আসে নাই। অথবা বেচারার ব্রেইনের জুস শ্যাষ হয়ে গেসিল; কে জানে!

প্রচন্ড ঘুমে আমি প্রায় পড়েই যাচ্ছি, অথচ আমার সামনে দরজায় দাঁড়ানো মানুষটা এক নাগাড়ে কথা বলে যাচ্ছে। সময় হিসেব করলে হয়ত সেটা অতটা বেশী না, বড়জোর দু-তিন মিনিট হবে হয়ত, কিন্তু অর্ধ-ঘুমন্ত এই আমার মনে হল হাজার বছর ধরে কথা বলছি আমরা।

আমরা মানে আমি আর আমার সামনে গোলাপী পোশাক পড়া কেও একজন। আমার ঘুম জড়ানো চোখে ভাল করে বুঝতেও পারছি না সে আসলে কে, আমি তাকে আদৌ চিনি কি না; তারপর আবার একসময় মনে হল হয়ত চার তলার শাহানা আপার বাসায় এসেছে, ভুল করে পাঁচ তলায় এসে পড়েছে। দুলাভাইর পক্ষের লোক হলে এমন হবার সম্ভাবনা শ’ তে শ’। ঠিক করলাম সেরকম কেও হলে খেঁকশিয়ালের মত খেঁকিয়ে বিদায় করে দিব। তারপর যখন ভাবছিলাম খেঁকশিয়াল কখনো খেঁক খেঁক করে ডাকে কি না, তখন হঠাৎ শুনলাম, “এতদিন পর কথা বলতেসি, আমাকে কি বাইরেই দাঁড় করিয়ে রাখবা নাকি!”

ভেতরে আসতে বললাম। কথাটা বললাম যেন ঘুমের অতল গহ্বর থেকে চেঁচিয়ে উঠলাম। তাররই হঠাৎ মনে হল, ডাকাত না ত আবার? বাসায় তো শুধু আমি একেলা, তারোপর ঘুম থেকেও জেগে উঠতে পারি নি ঠিক মতন, পুরো সজাগ হবার আগেই যদি হাত-পা-মুখ বেঁধে ফেলে? পরে ভাবলাম, নাহ্, ডাকাত-টাকাত না, তাহলে তো আরো আগেই আমার এই আধো-জাগা অবস্থার সুযোগ নিত; সেটা যখন করে নি, পরিচিত কোন মেহমানই হবে নিশ্চয়। কিন্তু কোন মেহমান?

মেহমানের কথা ভাবতে গিয়ে খেয়াল হল, আমি এখনো জানি না মানুষটা ছেলে না মেয়ে। হিসাব কষে দেখলাম, গলার স্বরের জন্য বাচ্চা ছোলোও বলা যায়, কিন্তু গোলাপী জামা আর মাথায় লম্বা চুল আবছা দেখতে পেয়ে স্বিদ্ধান্ত নিলাম আসলে সে মেয়ে। কারণ কোন পুরুষ, সে ডাকাতই হোক আর মেহমান, সে অবশ্যই মাথায় এতো লম্বা চুল নিয়ে গোলাপী জামা পড়ে আমার বাসায় আসবে না, তাই না?

সে ততক্ষণে গিয়ে বসেছে ড্রয়িং রুমের লম্বা সোফাটায়। একটু বিরক্ত হলাম, কারণ মেহমান হোক আর ডাকাতই হোক, তার সাথে আমি কথা কথা বলতে বলতে যে নরম তুলতুলে সোফাটায় শুব বলে ঠিক করেছিলাম, তাতে বসবার অধিকার ত তার নেই! যেহেতু সে মেয়ে, আর তারোপর মেহমান, তাই কিছু বললাম না; সোফার দিকে আর না এগিয়ে ‘পাথুরে’ ডিভানটায় গিয়ে বসব বলে ঠিক করলাম। কিন্তু মাথা ঘুরিয়ে যখন দেখলাম মেয়েটা তার পাশের গদিতে ছোট ছোট চাপড় মেরে সেখানটায় বসতে বলছে, তখন তা আমার কাছে দুর্নিবার মনে হল, আমি আর টাল সামলাতে না পেরে, বলা চলে লোভ লামলাতে না পেরে এক লাফে ধপ করে গিয়ে বসলাম মেয়েটার পাশে।

বসেই পেছনে হেলান দিয়ে আমি চোখ বন্ধ করে কি যেন ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম। আস্তে আস্তে মেয়েটার কথা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল, তারপর হঠাৎ “আরে, আর বোল না, তারপর…” কি কি কথা শুনতে শুনতেই ঘুমটা গেল হালকা হয়ে। মাথাটা সামান্য ঘুরিয়ে চোখ পিট পিট করে তাকালাম। মেয়েটা যে কেন আমি এখনও ঘুমে হাবুডুবু খাচ্ছি এটা বুঝে কথা বলা বন্ধ করে নি, তা যখন ভাবছি, তখন চেখে পড়ল মেয়েটা  খুব রস মিশিয়ে কোন ঘটনা বর্ণনা করছে, কিন্তু আমি তার আগা-মাথা কিছুই বুঝতে পারছি না। আসলে বুঝার চেষ্টাও করছি না, তার কথা গুলো আমার উপর বরং ঘুমের টনিকের মতই কাজ করছে; মেয়েটার হাত নাড়ানোর ভঙ্গী দেখতে দেখতে লক্ষ করলাম মেয়েটার দাঁত খুব সাদা।

আমি আবার ভাবতে শুরু করলাম। মেয়েটা কেন এখানে আমার কাছে এসেছে, মানে আসলেই কি আমার কাছে এসেছে কি না, তাও ত জানি না। মেয়েটার পরিচয় বের করতে বহু কষ্টে চোখের পাতা কয়েক মিলিমিটার ফাঁক করে তার চেহারার দিকে তাকালাম। মেয়েটার ওভাল শেপের চেহারা বুঝতে পারছি, কিন্তু ঢুলুনির চোটে চেহারায় নাক-মুখ কোথাও সেট করতে পারছি না, বরং দেখার ভুলে তিনটে চোখ আর দাঁতঅলা নাক দেখে আমি ঘুমে ঘুমেই হেসে দিলাম। মেয়েটা এবার ঠিক ঠিক খেঁকশিয়ালের মত খেঁকিয়ে উঠল, “হাসির কি হল? আমার অবস্থা নাজেহাল, আর তুমি হাসতেসো?”

ঘুমের ঢুলুনিতে তখন মেয়েটার কোলে আমার মাথাটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল, আমি তখন ভাবছিলাম এরলম হলে মেয়েটা কি করবে। যদি মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, তাহলে আমার কি করা উচিত হবে, এটা ভাবতে ভাবতেই সে হঠাৎ অমন করে বকে উঠল। আমি থতমত খেয়ে সোজা হয়ে বসলাম। মেয়েটা পরায় সাথে সাথেই রাগ মুছৈ ফেলে আবার আগের টোনে বলা শুরু করল, “তারপর তো আমি কি করব বুঝতেই পারতেসি না…”, এসব শুনতে শুনতে আমি আবার ঘুমিয়ে গেলাম। সোফা থেকে প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম এমন সময় মেয়েটা কোড়ামুড়ি দিয়ে বলল, “চা খাবা? আমি চা বানায়ে আনতেসি…” আমার ঘুমের মধ্যেই খেয়াল হল, বাসায় চিনি নাই, অথচ মেয়েটা চা বানাবে, তাই এই কথাটা বলতে যখন ছোট একটা হা করে দম নিলাম, তখন শুনলাম মেয়েটা “গাবা গাবা গা…” বলতে বলতে গট গট করে রান্না ঘরের দিকে চলে গেছে।

মেয়েটার শেষ কথাগুলো অবশ্যই এরকম ছিল না, কিন্তু ঘুমের মধ্যে এরকম ভুল শুনে আমি ফিক করে হেসে দিলাম।

…   …   …   …

** এরপর আর নাই!

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s